হরমুজ প্রণালিতে যেভাবে আটকে আছে বিশ্ব বাণিজ্য

মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বিশ্ব অর্থনীতিকে এক চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা গত কয়েক দশকের মধ্যে আর দেখা যায়নি। ফেব্রুয়ারির পর থেকেই বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। এর প্রভাব কেবল মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং ছড়িয়ে পড়েছে এশিয়া থেকে আমেরিকা পর্যন্ত। পরিসংখ্যান বলছে, সংকটে কেবল ব্যবসাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না, বরং মাঝসমুদ্রে আটকা পড়েছেন হাজার হাজার নাবিক। শত শত পণ্যবাহী জাহাজ এখন পারস্য উপসাগরে স্থবির হয়ে পড়ে আছে। এপির বিশ্লেষণে সম্প্রতি এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংকট ঘনীভূত হয় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর কয়েক সপ্তাহ ধরে ওই অঞ্চলে ভারি বোমাবর্ষণ চলেছে। গত মাসে মার্কিন নৌবাহিনী সেখানে অবরোধ আরোপ করলেও পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন করা যায়নি।

ইরানের পক্ষ থেকে সাফ জানিয়ে দেয়া হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধ এবং অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত তারা হরমুজ প্রণালি খুলবে না। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে নিতে চাইছেন। তিনি ইরানের বিতর্কিত পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধসহ আরো বড় ধরনের রাজনৈতিক ছাড় দাবি করছেন।

এক নজরে হরমুজ প্রণালির বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিসংখ্যান

» ২১ মাইল (৩৪ কিলোমিটার): হরমুজ প্রণালি ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী এ জলপথের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ২১ মাইল বা ৩৪ কিলোমিটার প্রশস্ত। এটি দেখতে অনেকটা বাঁকানো কনুইয়ের মতো। এখানকার পানি তুলনামূলক অগভীর।

» ২০ শতাংশ: পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যুদ্ধের আগে পথটি দিয়ে প্রতিদিন বিশ্বের মোট চাহিদার ২০ শতাংশ বা এক-পঞ্চমাংশ তেল সরবরাহ করা হতো। তেল ছাড়াও প্রাকৃতিক গ্যাস ও সারের বড় একটি অংশ এ পথেই পরিবহন করা হতো।

» ১০০-১৩০ জাহাজ: লয়েড’স লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন গড়ে ১০০-১৩০টি জাহাজ এ প্রণালি পার হয়েছে।

» ৫৩৪ জাহাজ: যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৪ মে পর্যন্ত মাত্র ৫৩৪টি জাহাজ এ প্রণালি পার হয়েছে, যার বেশির ভাগই ইরানের তেল বহন করছিল। স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এ সময়ের মধ্যে ৬ হাজার ৫০০ থেকে ৮ হাজার ৪৫০টি জাহাজ যাতায়াত করার কথা ছিল।

» ৫০ শতাংশ: যুদ্ধ শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গ্যাসের গড় দাম বেড়েছে ৫০ শতাংশ। এএএর তথ্যমতে, দেশটিতে গত বৃহস্পতিবার প্রতি গ্যালন গ্যাসের গড় মূল্য ছিল ৪ দশমিক ৫৬ ডলার। এছাড়া এ সংকটে জেট ফুয়েলের দামও প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

» ১০ শতাংশ পর্যন্ত: জাহাজ বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজে থাকা মালের ওপর বীমার হার ১ শতাংশ থেকে লাফিয়ে ১০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে।

» ৪ কোটি ৫০ লাখ: জাতিসংঘ বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) আশঙ্কা, প্রণালিটি দ্রুত খুলে দেয়া না হলে এশিয়া ও আফ্রিকার প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ দুর্ভিক্ষের সম্মুখীন হতে পারে। জ্বালানি ও সার সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় খাদ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে।

» ১০ জন: আন্তর্জাতিক মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইওএমওর) তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ১০ জন নাবিক প্রাণ হারিয়েছেন।

» ৩২ জাহাজ: একই সঙ্গে ৩২টি জাহাজ সরাসরি হামলার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মেরিটাইম সংস্থা।

» ১ হাজার ৫৫০ জাহাজ: মার্কিন সামরিক বাহিনীর হিসাব অনুযায়ী, ৮৭টি দেশের অন্তত ১ হাজার ৫৫০টি জাহাজ বর্তমানে পারস্য উপসাগরে আটকা পড়ে আছে।

» ২২ হাজার ৫০০ জন: সাগরে থাকা জাহাজে বর্তমানে ২২ হাজার ৫০০ জন নাবিক আটকা পড়েছেন। এদের একটি বড় অংশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নাগরিক।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির এ অচলাবস্থা যত দীর্ঘ হবে, বিশ্বজুড়ে মুদ্রাস্ফীতি তত বাড়বে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এ ধাক্কা সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।

আরও